রবিবার ১৩ জুন ২০২১

২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

ই-পেপার

Moniruzzaman

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ২৪,২০২১, ০৯:৪৭

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল মানবিকতা...


                                মোহাম্দ এনামুল হক (জীবন)
আমাদের সকলের জানা আছে বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের দেশের সকল ব্যাংকের মুরুব্বি ব্যাংক যাকে বলে রেগুলেটরী অথরিটি। দেশের সকল ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ, নীরিক্ষন পর্যবেক্ষন বা তদারকির দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ ব্যাংক নামক আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এক সময় বিভিন্ন ব্যাংকের প্রতিনিয়ত লেনদেন নিষ্পত্তিকল্পে প্রতিদিন দুইবার ক্লিয়ারিং হাউজে সকল ব্যাংকের প্রতিনিধি মিলিত হতেন এবং দেনা-পাওনা নিষ্পত্তি করতেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা যেখানে নেই সেখানে সোনালী ব্যাংকের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নেতৃত্বে অন্যান্য সকল ব্যাংকের লেনদেন নিষ্পাত্তি করতেন। কিন্তু বিগত কয়েক বৎসর আগ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক কেন্দ্রীয়ভাবে সারা দেশের সকল ব্যাংকের সকল শাখার লেনদেন ডিজিটাল তথা অনলাইন সিষ্টেমে দেনা –পাওনা নিস্পত্তি কওে থাকে। জমাকৃত চেকগুলোকে হাই ভেলু এবং ল-ভেলু দুইভাবে ভাগ করে থাকে। বড়-বড় চেকগুলোকে হাই ভেলু বিবেচনা করে একই দিনের ব্যাংকিং আওয়ারের মধ্যেই সেটেলমেন্ট করে এবং গ্রাহক প্রয়োজনে ঐ দিনেই টাকা উত্তোলন করতে পারে; কিন্তু ছোট-খাট চেকেগুলোকে নরমাল ভেলুতে ধরে সাধারনতঃ ব্যাংকিং আওয়ারের পরে সেটেলমেন্ট করে এবং গ্রাহক পরের দিনই টাকা উত্তোলন করতে হবে। আর যদি বৃহস্পতিবার হয়ে থাকে তাহলেতো কথাই নেই;টাকাটা উত্তেলন করতে হবে পরের সপ্তাহের রবিবার; মেয়ের বিয়ে থাকুক,ঈদ করা লাগুক কিংবা লাশ দাফন থাকুক সে ৪র্থ দিন ছাড়া টাকা উত্তোলনের কোন সুযোগ সাধারনতঃ পায়না। এক সময় যখন ডিজিটাল বা অনলাইন পদ্ধতি  ছিলনা তখন মেনুয়াল পদ্ধতিতে দুপুর ১টার মধ্যেই লেনদেন ক্লিয়ার করা হতো এবং ছোট-খাট শহরগুলোতেই নীরিহ অশিক্ষিত মহিলা-পুরুষ বিকেল ৩টা বাজার আগেই টাকাটা উত্তেণর করে প্রয়োজন মেটাতে পারতেন। এখন ডিজিটালে সেটা ডিফিকাল্ট  হয়ে গেছে! বিগত এক সপ্তাহে সারাদেশের কত অগনিত মানুষ মানবিক বিপর্যয়ের স্বীকার হয়েছে সেটা বাংলাদেশ ব্যাংকই সবচেয়ে ভালো জ্ঞাত। নিন্মে মাত্র একটি চেকের লেনদেনের ডিজিটাল মানবিকতা তুলে ধরছি। ভ’ক্তভোগী গ্রাহকের বক্তব্য তুলে “আমরা ভেসজ কনজুমার প্রডাক্টস লিঃ নামী একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানী। আমরা পাবলিক লিঃ কোম্পানী হলেও শুধুমাত্র ঢাকা শহরের মুষ্টিমেয় স্বাস্থ্য-সচেতন নাগরিকের জন্য কৃত্তিম রং, ক্যামিকেল ও ফ্লেবারমুক্ত, ন্যাচারাল, নিরাপদ এবং অরগানিকের নিরলস প্রচেষ্টায় সেবা করে যাচ্ছি; এমনি সচেতন এবং আকৃষ্ট হওয়া একটা নিয়মিত ভোক্তা পরিবার আমাদেরকে গত১০/০৪/২০২১ইং তারিখে ২,০০,০০০/ টাকার একটা চেক প্রদান কওে যার নম্বর ৪৮০৩৩৩১              এবং হিসাব নং গঝঅ ২১৫০২ ১৫০ ২০০১৭২৩০৯                              
 ইসলামী ব্যাংক এলিফ্যান্ট রোড শাখা এবং হিসাব ধারক কে এম মসজুরুল হক। আমরা কোম্পানীর হিসাব শিরোনাম ভেসজ কনজুমার প্রডাক্টস লিঃ নং ১৩৬১১১০০০০০৩৩২ উক্ত ২ লাখ টাকার চেকটি ১২/০৪/২০২১ ইং সোম বার আমাদের প্রিমিয়ার ব্যাংক রামপুরা শাখায় বেলা ১১টায় জমা দিলে ব্যাংক কতৃপক্ষ বলে আজ দেরী হয়ে গেছে, আগামী কালকের ক্লিয়ারিং এর জন্য প্লেস করবো। আমরা যথারীতি পরের দিন ১৩/০৪/২০২১ ইং মঙ্গলবার  রাত অবধি কোন মেসেজ না পেয়ে পরের দিন ব্যাংকে যোগাযোগ   করলে ক্লিয়ারিং এর দায়িত্বে নিয়োজিত অফিসার জানান যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সারভারে সমস্যার করনে কারোরই কোন চেক পাস হয়নি। আগামী কাল খবর নেবেন। অন্যদিকে চেক প্রদানকারী জানালেন আমাকে তো ব্যাংক থেকে ফোন করেছে, আমি অলরেডি বলে দিয়েছি চেকটা অনার করার জন্য (১৩/০৪/২১ইং)। আমরা যথারীতি পরের দিন বৃহস্পতিবার আবার যোগাযোগ করলে ব্যাংক কর্মকতা বলেন চেকটা ফেরৎ দিয়েছে, আগমী রবিবার আবার প্লেস করতে হবে।কিন্তু চেক প্রদানকারীকে জানালে তিনি বললেন আমার হিসাব থেকে তো টাকা ডেবিট করে নিয়েছে ১৩ তারিখেই; এসব না বলে আমাদের পন্যগুলো দিয়ে দিন। ৩ দিন পর রবিবার তথা ১৮/০৪/২১ আবার প্লেস করে। সন্ধ্যার পর আমার সংশ্লিষ্ট নাম্বারে একটা মেসেজ আসে যে আমাদের হিসাবে ২,০০,০০০/ ক্রেডিট হয়েছে এবং আমাদের হিসাব থেকে ১০/ সার্ভিস চার্জ ডেবিট হয়েছে। আমি যথারীতি পরের দিন ব্যাংকে টাকা উত্তেলনের জন্য গেলে ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন টাকা উত্তোলনের কোন সুযোগ নেই; কেননা বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদেরকে এমন দটো চেক পাস হয়েছে কিন্তু পেমেন্ট দেওয়ার জন্য মেসেজ দেয়নি! আপনি চলে যান, আমি জানাবো। আমার চেক প্রদানকারীকে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করলাম  সেদিন সারাদিন অপেক্ষা করলাম;  বিকাল অবধি কোন মেসেজ মোবাইলে পাওয়া গেলনা। বাধ্য হয়ে ব্যাংকের ক্লিয়ারিং কর্মকর্তার ব্যাক্তিগত নাম্বারে যোগাযোগ করে জানতে চাইলাম যদিও অফিস টাইম না তবুও বিরক্ত করছি আসলে আমাদের চেকটার কি হলো ? তিনি জানালেন বাংলাদেশ ব্যাংক   আমাদেরকে স্টপ রাখতে বলেছে আমরা কি করবো? তৎক্ষনাৎ ব্যাংকের অপারেশন ম্যানেজারকে ফোন দিয়ে জানতে চাইলাম ব্যাপারটা কি? কিছু জানতে পারেন ? বললেন আপনার পার্টির সাথে যোগাযোগ করুন; এটা ইসলামী ব্যাংক জানে কি কারনে বাংলাদেশ ব্যাংক পেমেন্টে দিতে  বলছে না,আমরা চেক প্রদানকারীকে অবহিত করলাম এবং  তিনি সাথে সাথে ইসলামী ব্যাংকে ফোন দিলেন বিষয়টা জনার জন্যে ; কিন্তু ওপার থেকে বললো, “আপনি হিসাব খুলতে যে নাম্বার দিয়েছেন সে নাম্বার থেকে ফোন দেননি তাই আপনাকে কিছু জানাতে পারবনা, আপনি কালকে ব্যাংকে আসুন। পরের দিন তিনি ব্যাংকে গেলেন ব্যাংক ১৮/০৪/২১ ইং যে চেকটি পাস করেছে তা বিস্তারিত দেখিয়ে বিদায় করে দেন। আর তিনিও পরের দিন১৯/০৪/২১ ইং সিরিয়াসলি আমাদেরকে প্রেসার দিলেন, আমার পন্যগুলো দিন । বললাম আমরা টাকাগুলো উত্তেলন করে দেরী করবো না আপনার পন্য সরবরাহ করবো। একটা দিন অপেক্ষা করুন দেখি কনফার্মেশন পাই কিনা? না পরের দিনও (২০/০৪/২১ ইং) ব্যাংক আওয়ার শেষ হলো কোন খবর নেই ; দুপুরের পর আবার অপারেশন ম্যানেজারকে বললাম আমরা কি টাকাটা উত্তেলন করতে পারবোনা? বললো আমাদের কি করার আছে ? চেকটাতো আপনার হিসাবে জমা করা আছে কিন্তুু আমরা তো  বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিশ্চয়তা পাইনি। কি  করবো কিংকতব্যবিমূড় হয়ে পড়লাম । পরের দিন ২১/০৪/২১ ইং আবার অপারেশন ম্যানেজারকে বললাম, আপনারা কি বাংলাদেশ ব্যাংকে একটু যোগাযোগ করতে পারেন না? একটা ফোন দিতে পারেন না? তার পর তিনি বললেন, আচ্ছা যোগাযোগ করে দেখি। সেদিন আবার যোগাযোগ করলে ব্যাংক কর্মকর্তা জানান আপনি আগমী কাল ব্যাংকে আসেন। পরের দিন অথাৎ ২২/০৪/২১ ইং ব্যাংকে গেলাম টাকাটা উত্তোলন করে একটা যুদ্ধ জয় করলাম।”ভুক্তভোগীর মূল ঘটনা শেষ।
 আমরা জানি যখন মান্দাতার আমলে কম্পিউটার, ডিজিটাল সিস্টেম তো দূরে থাকুক, মোবইল এবং টেলিফোন এরও কোন বালাই ছিলনা তখনও ক্লিয়ারিং হাউজে সেকেলে পদ্ধতিতে সকাল ৯টা থেকে ১০ টা পর্যন্ত চেক জমা করলে   দুপুর ২টা বাজেই টাকা উত্তোলন করা যেতো। যুগ যুগ ধরে এমন সার্ভিস চালু ছিল। এক দিনে হাজার হাজার গ্রাহকের চেকের এমন বিপযস্ত অবস্থা ! এসব গ্রাহকের মধ্যে এমনতো থাকতেই পারে ঐ দিনের চেকটি পাস হলে রোগী হাসপোতালে র্ভতি হতো, অপারেশন করানো জরুরী ছিল, কিংবা রোগী হাসপাতাল থেকে রিলিজ হতো প্রতিদিনের কাঁড়ি কাঁড়ি কষাইখানার বিল দেওয়া থেকে মুক্তি পেত। এসব হাসপাতাল নামক কষাইখানাখানা গুলোর অনেকটাতে রোগী ভর্তি করানোর আগেই অনেক বড় অঙ্কের টাকা অগ্রিম দিতে হয়! হতে পারে সেদিনকার চেকটা পাস হলে হাসপাতালে অগ্রিম দিয়ে জরুরী রোগী এডমিশন নিতো ,বিদেশগামী প্রবাসী, কিংবা ব্যাসায়ী তার ফ্লাইট কনর্ফাম করতো, অথবা পোটের পন্য খালাস করতো যার প্রতিদিন জরিমানা গুনতে হয়, কিংবা কারো ছেলে/মেয়ের বিয়ের ফাংশান করা হতো বা বিয়ের গয়না-গাটি কেনার আশা ছিল, ছেলের বিদেশ যাওয়া নিশ্চিত ছিল, কিংবা কোন এতিমখানায় চাল-ডাল তরি-তরকারী কিনে দেয়ার তারিখ ছিল, কিংবা মিস্কিন খাওয়ানোর তারিখ ছিল, কিংবা কোন দেনা নিস্পত্তির শেষ তারিখ ছিল, কিংবা মৃত লাশ  দাপনের উদ্দেশ্যে গ্রামের বাড়ীতে নেওয়া দরকার ছিল। এমন হাজারো মানবিক বিষয় থাকতে পারে। এমন সমস্যাগুলোর একদিনের ফিরিস্তির কি বর্ণনা করে শেষ করা যাবে ? 
বাংলাাদেশ ব্যাংকের সারভার সমস্যা হতেই পারে, এটা কোন অস্বাভাবিক বিষয় নয়; কিন্তু একটা মূল সার্ভারের পাশা-পাশি এক বা একাধিক ব্যাাকআপ সার্ভার থাকার কথা ছিল, ১৩ তারিখটা না হয়  আন-লাকী ছিল, ঐ দিন মঙ্গলবার না হয় অমঙ্গল ছিল,  পরের দিন ১৪ তারিখ বুধবার কিংবা তারও পরের দিন ১৫ তারিখ বৃহস্পতিবার কি বিষয়টা মানবিক বিবেচনায় আনা দরকার ছিল না ? যেহেতু এর পরই ২ দিন বন্ধ তার উপর কারপিউ মার্কা লগ-ডাউন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকতো শুধু মাত্র আমাদের ব্যাংকগুলোর দেশীয় সমস্যার সমাধান করে তা নয়, বরং দেশের বাইরের ব্যাংক এবং একেচেঞ্জ হাউজ গুলোর ফরেন রেমিট্যান্সএর লেনদেন করে এবং আর্ন্তজাতিক বহুবিধ লেনদেন ও বাণিজ্য পরিচালনা করে থাকে। বিশ্ব ব্যাংক, আই এম এফ কিংবা এ ডি বি এর সাথে অনেক ্ট্রান্জাকশন সম্পন্ন করে থাকে আরো করে থাকে এক্সর্পোট-ইম্পোট বাণিজ্যেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সেক্ষেত্রে ১৩ তারিখের সমস্যার সমাধান করতে যদি ২২ তারিখ পর্যন্ত ডিলে.... হয় তবে তার অন্তরালে কত অমানবিক বিপরজয় হচ্ছে তা কি বিবেচনা করার আছে ?
লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট,  আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সাংবাদিক সংস্থা, ঢাকা জেলা। 
 

POST COMMENT

For post a new comment. You need to login first. Login

COMMENTS(0)

No Comment yet. Be the first :)